
রেজাউল আশরাফ
কর আইনজীবী
আয়কর রিটার্ন দাখিল করা শুধু একটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। তবু বাস্তবে অনেক করদাতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হন। অথচ সময়মতো রিটার্ন না দিলে আর্থিক জরিমানা, কর সুবিধা হারানো, আইনি জটিলতা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
চলতি করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ মার্চ। তাই এই সময়সীমার মধ্যেই রিটার্ন জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের পর রিটার্ন দাখিল করলে প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তা হলো আর্থিক জরিমানা ও বিলম্ব সুদ। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ ধার্য হতে পারে, যা সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত গণনা করা সম্ভব। এর পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপ-কর কমিশনার সর্বশেষ প্রদেয় করের ১০ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ১,০০০ টাকা জরিমানা আরোপ করতে পারেন। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।
সময়ে রিটার্ন না দেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো কর রেয়াত ও কর অব্যাহতির সুবিধা হারানো। জীবনবিমা, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র কিংবা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে যে কর রেয়াত পাওয়া যায়, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে পাওয়া যায় না। একইভাবে অনেক ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সুবিধা বা হ্রাসকৃত কর হারের সুবিধাও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে আয় গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলে আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। নতুন আয়কর আইনে ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পদ—বিশেষ করে বিদেশে থাকা সম্পত্তির ক্ষেত্রে—তার ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হতে পারে।
বর্তমানে কর প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, ক্রেডিট কার্ড ইস্যু, নির্দিষ্ট সীমার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয়, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ নবায়নের মতো অনেক ক্ষেত্রেই রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হয়। ফলে সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে এসব সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে কর প্রশাসনকে আধুনিক করার লক্ষ্যে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় করদাতাদের সচেতন হওয়া জরুরি—কারণ সময়মতো রিটার্ন দাখিল করলে শুধু আইনি ঝুঁকি এড়ানো যায় না, বরং কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পায়।
পরিশেষে বলা যায়, আয়কর রিটার্ন দাখিলকে কেবল একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে—অর্থাৎ ৩১ মার্চের আগেই—রিটার্ন দাখিল করলে করদাতা যেমন নানা ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন, তেমনি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাও হবে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর।
নিজস্ব সংবাদ : 
























