ঢাকা ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত ও পেশাদার ছিনতাইকারী সাদ্দামকে গ্রেফতার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ Logo সততা, দায়িত্ববোধ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে — মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী Logo কোরবানির হাটের বর্জ্য অপসারণ শেষে তেজগাঁওয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন Logo ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত…স্বাস্থ্যমন্ত্রী Logo দুধ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে – মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী Logo মধ্যনগরে ১০২ হাফেজকে সংবর্ধনা দিল ইসলামি ছাত্র পরিষদ Logo হরিপুরে দগ্ধ নারীর মরদেহ উদ্ধার, আতঙ্কিত এলাকাবাসী Logo পদ্মা ও যমুনা সেতুতে আধুনিক ইটিসি প্রযুক্তির সুফল : ঈদুল আযহার ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা ছিল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন Logo লিবিয়া থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন Logo কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের খোঁজ নিতে ঝটিকা সফরে ভোলায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী
গায়ের রং নিয়ে সমাজের চাপ, প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণায় বদলে যেতে চাওয়া এক তরুণীর গল্প; আর মায়ের অটুট স্নেহের করুণ বাস্তবতা

বর্ণবাদ ও মা মেয়ে

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৯:২৩:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • ৫৩৩ বার পড়া হয়েছে

শ‍্যামলী পিসি কালচার এলাকার বাড়িগুলো এমন গায়ে গায়ে লাগানো যে ঘরের কথা পরে জানতে তিলমাত্র সমস্যা হয় না॥ এক বাসার আমের আচারের ফোড়নের গন্ধ পাশের বাড়ির পোয়াতি বধূর মুখকে লালায়িত করে। রাতের নীরবতায় এক ফ্ল‍্যাটের নব দম্পতির অন্তরঙ্গতার আদুরে শব্দ শুনে পাশের বাসার বিগতযৌবনা পুরুষ আন্দোলিত হয়।
কান পাততে হয় না- ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সব কিছু শোনা যায়। পাশের চারতলার মা মেয়ের দৈনন্দিন ঝগড়া শুনে অনায়াসে বোঝা যায়, মেয়ে অনলাইনে নানাবিধ রুপ চর্চার সামগ্রী অর্ডার করে ও দিনরাত সেগুলো শরীরের সম্ভব অসম্ভব সব স্হানে মাখে! মা স্বভাবতই খ‍্যাচখ‍্যাচ করে তবে কোন সুরাহা হয়না!
একটি কলিং বেলের শব্দ তার দশ মিনিটের মধ্যে ঝগড়া! কখনও কান্নাকাটি কখনও ধড়াম করে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেবার শব্দে এই ইনিংসর বিরতি হয় !
তার মা বুকে ব‍্যথা নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন! নব্বই কেজি ওজনের ভারী শরীর টেনে চারতলায় উঠে বেশ হাফাচছেন! তিনি নিয়মিত প্রেসারের ঔষধ খান তারপরও প্রেসার বাড়তি। আমাদের সাদ্দামের মা খালার মুখে কিছু আটকায় না- ফস করে বলে বসে, দিনরাত হাউকাউ- হের প্রেসার বাড়ব না তো কার বাড়ব? মৃদু স্বরে বলি, এত স্ট্রেস কেন নেন !?
ভদ্রমহিলা মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে যান! হিজাব দিয়ে আলগোছে চোখের কোনে চলে আসা পানি মোছেন!
মেয়ের কারনে – মেয়ের নাম শিমু- রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করে॥
ঘটনা হলো, পুরা ইউনিভার্সিটি লাইফে এক ছেলের সাথে প্রেম।ডিজিটাল যুগে চোখে চোখ রেখে আংগুলে আংগুল ছুঁয়ে প্রেম সীমাবদ্ধ থাকে না! আগে ইয়ে করে বিয়ে হতো এখন বিয়ের আগেই ইয়ে হয়ে যায় ! I

যখন বিয়ের সময় এসেছে তখন ছেলে বলে, তার মা কিছুতেই কালো মেয়ের সাথে তার  বিয়ে দিবেন না! মরে গেলেও না ! কি অশালীন অসভ্য  বর্ণবাদী কথা – তাও এই জমানায়!
কিছু অভিযোগ খন্ডন করা যায় কিন্তু এই বিষয়টি এত স্পর্শকাতর যে অন্তরকে কেবল খন্ড বিখন্ড করে,খন্ডানো যায় না।

ঘৃণা হয় ছেলেটির প্রতি ! সম্পর্কের সাম্পান এ সওয়ার হবার সময় সে কি তার মায়ের রুচি জানতো না?  পাঁচটি বছর যে শরীরের একটি তিলও তার নজর এড়ায়নি অথচ কালা ধলার বিষয়টা নজরআন্দাজ করে গেছে???

না কি , প্রেমের বাহুডোর,বিরহের অশ্রু, প্রতীক্ষার ব‍্যকুলতা, অসুখে যত্ন, উত্তেজনায় রক্তমাংসের একটি আস্ত নারীদেহ খুব সহজে দেনমোহর উসুল না করেই পাওয়া হয়ে গেছে বলে এ কেবলই বাহানা???

ছেলেটি ফর্সা একটি মেয়েকে মায়ের ইচ্ছায় বিয়ে করে যে কিনা পেশায় দন্ত চিকিৎসক!
শিমু বদলা নিতে পারবেনা বলেই বোধহয় নিজের গায়ের রং বদলাতে উঠে পড়ে লাগে॥ যে যা টোটকা বাতলায়, অনলাইনে যত দেশি বিদেশি রং ফর্সাকারী ক্রিম দেখে সব কিনে মুখে উপর্যুপরি ব‍্যবহার করে! সেই সাথে পার্লারে রং উজ্জ্বল করার ফেসিয়াল মাসে দু-তিন বার তো আছেই।

এসথেটিক সেন্টারের ট্রিটমেন্ট অনুযায়ী ট‍্যাবলেট ইনজেকশনের পাশাপাশি ঘরোয়া পদ্ধতিতে মাজা ঘষা কোনটাই বাদ যায় না।
নিজের বেতনের টাকার সিংহভাগ সে ফর্সা হবার জন্য ব্যয় করে॥ বান্ধবীদের সাথে মেলামেশা, আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া সব বাদ দিয়ে সে অষ্ট প্রহর এক সোনার হরিণের পেছনে ছোটে॥ তার কাছে জগৎ এর সব রং এখন গায়ের রং এ ঠেকেছে!

আমাদের জমানায় ফর্সা মানেই সুন্দর- রূপচর্চা মানেই হলুদ বেসন আর দুধের সরে রং ফর্সা করা। আমি যেহেতু বাপের গুষ্টির কারনে জন্মসূত্রেই সাদা সেহেতু এই নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি কিন্তু আজকালকার দিনে  বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কেউ যে এই বিষয়ে এতটা সিরিয়াস হতে পারে সেটা দেখে তাজ্জব হই।

ভদ্রমহিলার বাটন ফোনটা অনেকক্ষণ থেকেই ভো ভো করছিলো – সেটা কানে লাগিয়ে অপর পক্ষের কথা শুনে ভদ্রমহিলার মুখ শুকিয়ে যায় !
তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, শিমু গায়ের রং ফর্সা করার কি এক ইনজেকশন নিচ্ছে- এটা যেদিন নেয় বমি করে ঘর ভাসায়, দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে – আজও সেই অবস্থা!
তিনি ভারী শরীরে যতটা সম্ভব দ্রুত সিঁড়ি টপকে নামেন – হাজার ঝগড়া হোক – মা তো! প্রকৃতির অসংগতির বিরুদ্ধে তার শ‍্যামলবরণ মেয়েটির  নীরব যুদ্ধে তার সমর্থন নেই সত্য -কিন্তু দুনিয়ার চোখে কালো মেয়েটি যে মায়ের জীবনের আলো। অপত্য স্নেহ গায়ের রং এ হেরফের হয়না!

লেখিকা : ডাঃ সাবরিনা মিষ্টি

জনপ্রিয় সংবাদ

হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত ও পেশাদার ছিনতাইকারী সাদ্দামকে গ্রেফতার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ

গায়ের রং নিয়ে সমাজের চাপ, প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণায় বদলে যেতে চাওয়া এক তরুণীর গল্প; আর মায়ের অটুট স্নেহের করুণ বাস্তবতা

বর্ণবাদ ও মা মেয়ে

আপডেট সময় ০৯:২৩:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

শ‍্যামলী পিসি কালচার এলাকার বাড়িগুলো এমন গায়ে গায়ে লাগানো যে ঘরের কথা পরে জানতে তিলমাত্র সমস্যা হয় না॥ এক বাসার আমের আচারের ফোড়নের গন্ধ পাশের বাড়ির পোয়াতি বধূর মুখকে লালায়িত করে। রাতের নীরবতায় এক ফ্ল‍্যাটের নব দম্পতির অন্তরঙ্গতার আদুরে শব্দ শুনে পাশের বাসার বিগতযৌবনা পুরুষ আন্দোলিত হয়।
কান পাততে হয় না- ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সব কিছু শোনা যায়। পাশের চারতলার মা মেয়ের দৈনন্দিন ঝগড়া শুনে অনায়াসে বোঝা যায়, মেয়ে অনলাইনে নানাবিধ রুপ চর্চার সামগ্রী অর্ডার করে ও দিনরাত সেগুলো শরীরের সম্ভব অসম্ভব সব স্হানে মাখে! মা স্বভাবতই খ‍্যাচখ‍্যাচ করে তবে কোন সুরাহা হয়না!
একটি কলিং বেলের শব্দ তার দশ মিনিটের মধ্যে ঝগড়া! কখনও কান্নাকাটি কখনও ধড়াম করে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেবার শব্দে এই ইনিংসর বিরতি হয় !
তার মা বুকে ব‍্যথা নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন! নব্বই কেজি ওজনের ভারী শরীর টেনে চারতলায় উঠে বেশ হাফাচছেন! তিনি নিয়মিত প্রেসারের ঔষধ খান তারপরও প্রেসার বাড়তি। আমাদের সাদ্দামের মা খালার মুখে কিছু আটকায় না- ফস করে বলে বসে, দিনরাত হাউকাউ- হের প্রেসার বাড়ব না তো কার বাড়ব? মৃদু স্বরে বলি, এত স্ট্রেস কেন নেন !?
ভদ্রমহিলা মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে যান! হিজাব দিয়ে আলগোছে চোখের কোনে চলে আসা পানি মোছেন!
মেয়ের কারনে – মেয়ের নাম শিমু- রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করে॥
ঘটনা হলো, পুরা ইউনিভার্সিটি লাইফে এক ছেলের সাথে প্রেম।ডিজিটাল যুগে চোখে চোখ রেখে আংগুলে আংগুল ছুঁয়ে প্রেম সীমাবদ্ধ থাকে না! আগে ইয়ে করে বিয়ে হতো এখন বিয়ের আগেই ইয়ে হয়ে যায় ! I

যখন বিয়ের সময় এসেছে তখন ছেলে বলে, তার মা কিছুতেই কালো মেয়ের সাথে তার  বিয়ে দিবেন না! মরে গেলেও না ! কি অশালীন অসভ্য  বর্ণবাদী কথা – তাও এই জমানায়!
কিছু অভিযোগ খন্ডন করা যায় কিন্তু এই বিষয়টি এত স্পর্শকাতর যে অন্তরকে কেবল খন্ড বিখন্ড করে,খন্ডানো যায় না।

ঘৃণা হয় ছেলেটির প্রতি ! সম্পর্কের সাম্পান এ সওয়ার হবার সময় সে কি তার মায়ের রুচি জানতো না?  পাঁচটি বছর যে শরীরের একটি তিলও তার নজর এড়ায়নি অথচ কালা ধলার বিষয়টা নজরআন্দাজ করে গেছে???

না কি , প্রেমের বাহুডোর,বিরহের অশ্রু, প্রতীক্ষার ব‍্যকুলতা, অসুখে যত্ন, উত্তেজনায় রক্তমাংসের একটি আস্ত নারীদেহ খুব সহজে দেনমোহর উসুল না করেই পাওয়া হয়ে গেছে বলে এ কেবলই বাহানা???

ছেলেটি ফর্সা একটি মেয়েকে মায়ের ইচ্ছায় বিয়ে করে যে কিনা পেশায় দন্ত চিকিৎসক!
শিমু বদলা নিতে পারবেনা বলেই বোধহয় নিজের গায়ের রং বদলাতে উঠে পড়ে লাগে॥ যে যা টোটকা বাতলায়, অনলাইনে যত দেশি বিদেশি রং ফর্সাকারী ক্রিম দেখে সব কিনে মুখে উপর্যুপরি ব‍্যবহার করে! সেই সাথে পার্লারে রং উজ্জ্বল করার ফেসিয়াল মাসে দু-তিন বার তো আছেই।

এসথেটিক সেন্টারের ট্রিটমেন্ট অনুযায়ী ট‍্যাবলেট ইনজেকশনের পাশাপাশি ঘরোয়া পদ্ধতিতে মাজা ঘষা কোনটাই বাদ যায় না।
নিজের বেতনের টাকার সিংহভাগ সে ফর্সা হবার জন্য ব্যয় করে॥ বান্ধবীদের সাথে মেলামেশা, আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া সব বাদ দিয়ে সে অষ্ট প্রহর এক সোনার হরিণের পেছনে ছোটে॥ তার কাছে জগৎ এর সব রং এখন গায়ের রং এ ঠেকেছে!

আমাদের জমানায় ফর্সা মানেই সুন্দর- রূপচর্চা মানেই হলুদ বেসন আর দুধের সরে রং ফর্সা করা। আমি যেহেতু বাপের গুষ্টির কারনে জন্মসূত্রেই সাদা সেহেতু এই নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি কিন্তু আজকালকার দিনে  বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কেউ যে এই বিষয়ে এতটা সিরিয়াস হতে পারে সেটা দেখে তাজ্জব হই।

ভদ্রমহিলার বাটন ফোনটা অনেকক্ষণ থেকেই ভো ভো করছিলো – সেটা কানে লাগিয়ে অপর পক্ষের কথা শুনে ভদ্রমহিলার মুখ শুকিয়ে যায় !
তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, শিমু গায়ের রং ফর্সা করার কি এক ইনজেকশন নিচ্ছে- এটা যেদিন নেয় বমি করে ঘর ভাসায়, দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে – আজও সেই অবস্থা!
তিনি ভারী শরীরে যতটা সম্ভব দ্রুত সিঁড়ি টপকে নামেন – হাজার ঝগড়া হোক – মা তো! প্রকৃতির অসংগতির বিরুদ্ধে তার শ‍্যামলবরণ মেয়েটির  নীরব যুদ্ধে তার সমর্থন নেই সত্য -কিন্তু দুনিয়ার চোখে কালো মেয়েটি যে মায়ের জীবনের আলো। অপত্য স্নেহ গায়ের রং এ হেরফের হয়না!

লেখিকা : ডাঃ সাবরিনা মিষ্টি